এফডিআইয়ের ৬ ভাগের ১ ভাগ এসেছে ০.০০১% জমিতে

প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধিতে ইপিজেডই এগিয়ে

মাত্র ১৩ দশমিক ৯৫ বর্গকিলোমিটার ভূমি—মানচিত্রে বাংলাদেশের মোট আয়তনের তুলনায় এ জায়গা উপস্থাপন করতে গেলে প্রায় অদৃশ্য হয়ে যাবে।

মাত্র ১৩ দশমিক ৯৫ বর্গকিলোমিটার ভূমি—মানচিত্রে বাংলাদেশের মোট আয়তনের তুলনায় এ জায়গা উপস্থাপন করতে গেলে প্রায় অদৃশ্য হয়ে যাবে। কিন্তু এ ক্ষুদ্র আয়তনেই তৈরি হয়েছে দেশের রফতানি ও বিদেশী বিনিয়োগের এক অনন্য গল্প। বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) নয়টি জোন কার্যক্রম পরিচালনা করছে যে জমিতে তা বাংলাদেশের আয়তনের মাত্র দশমিক শূন্য শূন্য ১ শতাংশ। কিন্তু দেশের মোট প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের (এফডিআই) প্রায় ছয় ভাগের এক ভাগ এসেছে এ জোনগুলোয়। বেপজা এ বছর ৪৫ বছরে পা রেখেছে।

কম জমি ব্যবহার করে বেপজা তুলনামূলক বেশি বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। এফডিআই প্রবৃদ্ধিতেও ইপিজেড-বহির্ভূত (নন-ইপিজেড) এলাকার চেয়ে ইপিজেডগুলো এগিয়ে। দেশে বিদেশী বিনিয়োগের গতিপ্রকৃতি নিয়ে নিয়মিতভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২০ সালে দেশের নন-ইপিজেড এলাকায় এফডিআই প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। ওই বছর ইপিজেডে এফডিআই প্রবৃদ্ধি হয় ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ।

২০২১ সালে ইপিজেড-বহির্ভূত এলাকায় এফডিআই প্রবৃদ্ধি হয় ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। ওই বছর ইপিজেডে এফডিআই প্রবৃদ্ধি ছিল ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ। এর পরের দুই বছর ইপিজেডে এফডিআই প্রবৃদ্ধি কমে আসে। ইপিজেডগুলোয় ২০২২ ও ২০২৩ সালে এফডিআই প্রবৃদ্ধি হয়েছে যথাক্রমে ২ দশমিক ৪ ও ঋণাত্মক দশমিক ৯ শতাংশ। ওই দুই বছর ইপিজেড-বহির্ভূত এলাকায় এফডিআই প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ২২ দশমিক ৯ ও ৪ দশমিক ১ শতাংশ। সর্বশেষ ২০২৪ সালে ইপিজেড-বহির্ভূত এলাকায় এফডিআই প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ৬৯ শতাংশ হলেও ইপিজেডে এফডিআই প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ।

১৯৮৩ সালে চট্টগ্রাম ইপিজেডের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে বেপজা। সংস্থাটির দাবি, এ উদ্যোগ বিদেশী বিনিয়োগ ও রফতানির নতুন দিক উন্মোচন করে। এখানে ১০ বছরের পরীক্ষিত সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৩ সালে গড়ে ওঠে ঢাকা ইপিজেড। এরপর পর্যায়ক্রমে মোংলা, কুমিল্লা, ঈশ্বরদী, উত্তরা, কর্ণফুলী ও আদমজী ইপিজেড চালু হয়। এছাড়া ২০১৮ সালে শুরু হওয়া মিরসরাইয়ের বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ এখন শেষ পর্যায়ে।

বর্তমানে বেপজার অধীনে পরিচালিত নয়টি জোনের মোট আয়তন ৩ হাজার ৪৪৫ একর বা ১৩ দশমিক ৯৫ বর্গকিলোমিটার, যা দেশের মোট আয়তনের মাত্র দশমিক শূন্য শূন্য ১ শতাংশ। এ ক্ষুদ্র আয়তনে বিনিয়োগ হয়েছে ৭ দশমিক শূন্য ৮ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি এফডিআই। ১৯৮৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত রফতানি আয় ১১৯ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং কর্মসংস্থান হয়েছে ৫ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি মানুষের।

বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল আবুল কালাম মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান বলেন, ‘বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতে তুলনা করলে হয়তো ৪৫ বছরে ৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ বড় অংক মনে নাও হতে পারে। কিন্তু দেশের আয়তনের মাত্র দশমিক শূন্য শূন্য ১ শতাংশ জমি থেকে মোট এফডিআইয়ের ছয় ভাগের এক ভাগ এসেছে—এটাই আমাদের প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।’

গত অর্থবছরে দেশের মোট রফতানির ১৭ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ এসেছে বেপজার আওতাধীন ৪৫১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে, যার পরিমাণ ৮ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে ৩৮ দেশের বিনিয়োগকারী বেপজার বিভিন্ন জোনে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। রফতানি বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পোশাকনির্ভরতা কমিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর ও বহুমুখী শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির।

বেপজার সাফল্যের পেছনে রয়েছে সুপরিকল্পিত অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও সেবা। প্রতিটি জোনে রয়েছে কাস্টমস, ব্যাংক, ফায়ার স্টেশন, পুলিশ ক্যাম্প, মেডিকেল সেন্টার ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা। এছাড়া শ্রমিকদের জন্য ক্যান্টিন ও বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা আছে। তাদের সন্তানদের জন্য রয়েছে বেপজা পাবলিক স্কুল ও কলেজ, ভর্তুকি মূল্যে শিক্ষা, ডে-কেয়ার। ইপিজেডগুলো শ্রমিকের আর্থসামাজিক রূপান্তরে দৃশ্যমান ভূমিকা রেখেছে।

নির্বাহী চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল জিয়া বলেন, ‘‌আমরা এমন পরিবেশ তৈরি করতে চাই, যেখানে বিনিয়োগকারী শুধু উৎপাদনে মনোযোগ দেবেন, বাকি সবকিছু আমরা সামলে নেব।’

বেপজা জানিয়েছে, সংস্থাটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বা রোডম্যাপের মধ্যে রয়েছে পটুয়াখালী ও যশোরে নতুন ইপিজেড, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ ও সিলেটে নতুন জোন স্থাপন। এছাড়া রোডম্যাপে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ইউরোপ-আমেরিকার বাইরেও জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকার বাজারে প্রবেশ এবং অটোমেশন ও এআই-ভিত্তিক উৎপাদন।

বন্দর সক্ষমতা ও জ্বালানি সরবরাহে উন্নতি দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান। তার কথায়, ‘এনার্জি আর বন্দর—এ দুই জায়গায় উন্নতি করতে পারলে বিনিয়োগ সূচক এক ধাক্কায় অনেক এগিয়ে যাবে।’

আরও